মোঃ আনিসুর রহমানঃ
বইয়ে ছাপানো চিত্র দেখে চিত্রাঙ্কন শেখা ছেলেটি আজ দেশ বরেণ্য চিত্রশিল্পী অধ্যাপক ড.হীরা সোবহান। ড. হীরা সোবহান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ে চারুকলা অনুষদে চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা, ছাপচিত্র বিভাগে প্রিন্টমেকিং ডিসিপ্লিন এ প্রফেসর হিসেব অধ্যাপনা করেন।তিনি ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার নন্দিবাড়ী গ্রামে ১৯৭০ সালের ২৪ মে জন্ম গ্রহণ করেন। চিত্রশিল্পী অধ্যাপক ড. হীরা সোবহান চার ভাই এক বোনের মধ্যে তৃতীয়।
তাঁর অন্যান্য ভাইবোনেরা হলো যথাক্রমে আলহাজ্ব আব্দুল করিম (১৯৫৫), আলহাজ্ব আব্দুর রশীদ (১২ ডিসেম্বর ১৯৬৪), একমাত্র বোন মোছা. খালেদা বেগম (৫ জুন ১৯৭৪) এবং সর্বকনিষ্ঠ ভাই মো. আব্দুল আজিজ মুক্তা (১০ মে ১৯৭৭)। তার বাবার নাম মরহুম আলহাজ্ব ফয়জুর রহমান এবং মাতার মরহুমা করিমন নেসা। অধ্যাপক ড. হীরা সোবহান এর পুরো নাম হচ্ছে মোঃ আব্দুস সোবহান হীরা। ছোটবেলায় পড়তে বসে পাঠ্য বইয়ের পাতা উল্টিয়ে চিত্রগুলো দেখতেন।
ছাপানো ছবি দেখে মনে মনে ভাবতেন তিনি নিজেই ছাপাই ছবিগুলো আঁকাবেন ? যেই ভাবনা সেই কাজ তখন থেকেই ছবি আকার শুরু করেন ড. হীরা সোবহান। মাথার চুলে লেগে থাকা তেলে কাগজ ঘষে বই-এ ছাপানো ছবির উপর রেখে তা দেখে দেখে নকল করে ছবি আঁকতেন। ঘরের দেয়ালে মাছ, লতা-পাতাসহ হরেক রকম জিনিসের ছবি আঁকতেন তিনি। তার বাবা তার আঁকা ছবি দেখে উৎসাহ না দিলেও কখনো বাধা দিতেন না।
তবে তার মা সবসময় তাকে উৎসাহ দিতেন। জীবনে ছবি এঁকে প্রথম উপার্জন করেছিলেন একশত টাকা। মোরগ মার্কা কয়েলের প্যাকেটে মোরগের ছবি দেখে ট্রাকের পিছনে ছবি অঙ্কন করেছিলেন তিনি। ছবি আঁকা দেখে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা ছোটবেলা থেকেই তার প্রশংসা করতেন। জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্ম দেখে তিনি চারুকলায় পড়ার অনুপ্রেরণা পান। তৎকালীন শহীদ স্মৃতি কলেজের অধ্যক্ষের পরামর্শক্রমে ভর্তি হন আর্ট কলেজে।
পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) চারুকলা অনুষদে ভর্তির সুযোগ পেলে পরিবারের অনিহা সত্ত্বেও তিনি ১৯৮৯ সালে ছাপচিত্র বিভাগে ভর্তি হন। এরপর ১৯৯৩ সালে ঢাবি চারুকলা থেকে ছাপচিত্রে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থানে বিএফএ ডিগ্রি এবং ১৯৯৫ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থানে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। রাবি থেকে ‘বাংলাদেশের ছাপচিত্রকলা এবং তিন জন শিল্পী : সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া ও মনিরুল ইসলাম (১৯৪৮-২০০৮)’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে বাংলাদেশে ছাপচিত্রে সর্বপ্রথম পিএইচডি সম্মাননা লাভ করেন ২০১১ সালে।
তিনি মুর্ত, অর্ধবিমূর্ত ও বিমূর্ত আধুনিক শিল্পরীতিতে শিল্প নির্মাণে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। উডকাট, এচিং, অ্যাকোয়াটিন্ট, সফটগ্রাউন্ড, ড্রাইপয়েন্ট, স্টোনলিথোগ্রাফি, মনোটাইপ, মেজোটিন্ট, কলোগ্রাফ ও মিশ্রমাধ্যমে এদেশের প্রকৃতি, চলমান জীবনযাত্রা, দুর্যোগ, সমাজের নানা অসঙ্গতি, সমাজের অবক্ষয়, ক্ষয়িষ্ণু দেয়ালচিত্র, সময়ের বেড়াজালে আবদ্ধ মানবকুল. সুখ-দুঃখ ইত্যাদি বিষয়াদির এক বিনিসুঁতোয় গেথেঁছেন শিল্প-সম্ভার।
তিনি ২০০৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’র জাতীয় চিত্রশালায় ‘জীবন ও সময়ের চিত্রকল্প’ শীর্ষক প্রথম একক ছাপচিত্রকলা প্রদর্শনী এবং একই সালে একই স্থানে দ্বিতীয় একক চিত্রকলা প্রদর্শনী করেন। ২০১৯ সালে ঢাকায় আলিয়ঁস ফ্রসেজঁ-এ লা গ্যালারিতে ‘জীবন ও সময়ের আখ্যান’ শীর্ষক তৃতীয় একক মিনিয়েচার চিত্র প্রদর্শনী করেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৮৯ টি জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও অন্যান্য দলীয় চিত্রকর্ম প্রদর্শনীতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেছেন।
ছাপচিত্রে বিশেষ অবদান সরুপ জয়নুল আবেদিন, এস.এম. সুলতান, মাওলান ভাসানী সম্মাননাসহ পেয়েছেন ললিতকলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমি থেকে সম্মাননা পুরস্কার, বিভাগের শ্রেষ্ঠ নিরীক্ষামূলক পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদকসহ আরো অনেক পুরস্কার। কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৯৭ সালে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৩ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মজীবন অতিবাহীত করার পর তিনি যোগদান করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অধিনে নড়াইলে এস. এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় প্রতিষ্ঠাতা কিউরেটর হিসেবে।
পরবর্তীতে ২রা জুলাই ২০০৬ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) চারুকলা বিভাগে বর্তমান চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র শাখায় প্রভাষক পদে যোগদান করেন। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরসহ দেশ-বিদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁরচিত্রকর্ম সংগৃহীত রয়েছে। স্বীকৃত জার্নালে তাঁর চারুকলা বিষয়ক গবেষণা মূলক ৬টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ছাপচিত্রকলা’ ও ‘ছাপাই ছবির করণকৌশল’ বিষয়ক দুটি অ্যাকাডেমিক গ্রন্থ ‘প্রথম প্রকাশন’, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। রাবি চারুকলার শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ক্লাসের বাইরে ছাপচিত্র নিয়ে কাজ করতে পারে তাই তিনি নিজের অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেহেরচন্ডি এলাকায় একটি ছাপচিত্র স্টুডিও করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপচিত্র ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরাই সেটা পরিচালনা করবেন।
