ডাঃ মোঃ আনিসুর রহমান জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ফেনী।
এটি সালমোনেলা গ্যালিনেরাম নামক ব্যাকটেরিয়া (এরোবিক)দ্বারা সৃষ্ট মুরগির একটি রোগ। পি এইচ ৪-৯ এর মধ্যে এরা ভাল বংশ বিস্তার করতে পারে। আদ্র পরিবেশে ২০-৪৪ ডিগ্রী সেঃ তাপমাত্রায় এই জীবানুর বংশ বিস্তারের জন্য উপযোগী। এই রোগ আর্দ্র সেড ও খাবারের মাধ্যমেই বেশী ছড়ায়। তবে খাদ্যকে ৮০ ডিগ্রী সেঃ তাপমাত্রায় পিলেটিং করলে এই রোগ ছড়াতে পারেনা। মুরগির সব বয়সেই এই রোগ হয় তবে ডিম পাড়ার শুরুর সময়েই এই রোগ বেশী হতে দেখা যায়। মর্টালিটি ১০-৯০% পর্যন্ত হতে পারে, ১০-২০% ডিমের হার কমে যেতে পারে।
ইনকিউবেশান পিরিয়ড ৬-৭ দিন তবে অনুকুল পরিবেশে এক বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। নোংরা পরিবেশে গাদাগাদি করে পালন করা, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ও ঠান্ডা লাগা সমস্যা থকে এই রোগের সংক্রমন হতে পারে। সালমোনেলা ব্যাটেরিয়ার ২২০০ টি সিরোটাইপ আছে। সাধারনত: বাড়ীতে পালনকৃত দেশী মোরগ মুরগিই এই রোগের বাহক। সাধারনত: খাদ্য, দেশী মোরগ মুরগি, ইঁদুর, চিকা, ভিজিটর, ইনকুবেটর,ডিম, তেলাপোকা, পোকামাকড়,পাখি ইত্যাদির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়।
হঠাৎ করে কিছু বাচ্চা, মোরগ মুরগি মারা যায়, বেশী পানি পান করা, ঝিমানো, খাওয়া কমিয়ে দয়ে, নিস্তেজতা, পাতলা পায়খানা, টোপ ঝুটি বিবর্ন ও ছোট হয়ে যায়, সবুজ সালফার বা হলুদ পাতলা পায়খানা করে, অনেক সময় আমাশয় বলে অনেকে ভুল করে, সাদা বা হলুদ মল মলদ্বারে লেগে থাকতে দেখা যায় ওজন কমে যায়, ডিম কমে যায়, খাওয়া কমে যায়, ফাইব্রিনাস পেরিটোনাইটিস দেখা যায়।
প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ ভাল বোঝা যায়না। লিভার বড় হয়ে যায় কাঁসার মত/পিতলের মত রং বা মেহগনির মত রং ধারন করে। অনেক সময় লিভার উজ্জল সবুজ বর্নের হয়( প্যাথোগনোমোনিক লিশান), ফুসফুস ইডিমেটাস ও কনজেসটেড, ফুসফুস পানিতে রাখলে ডুবে যায়। প্লীহা বিবর্ন ও বড় হয়ে যায়, পেটের ভিতরে ভাঙ্গা ডিম পাওয়া যায়।
রোগ প্রতিরোধে ভাল কম্পানির ও ভাল হ্যাচারীর বাচ্চা নিতে হবে। বায়োসিকিউরিটি মেনে চলতে হবে। পানিতে প্রোবায়োটিকস, ক্লোরিন ও এসিডিফাইয়ার যেকোন একটি ব্যবহার করতে হবে। সেডে/ঘরে নিয়মিতভাবে জীবানু নাশক স্প্রে করতে হবে। সেডের পরিবেশ শুকনা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি সম্ভব হয় উদ্ভিজ্জ আমিষ ব্যবহার করতে হবে। নিয়মিত টিকা প্রদান করতে হবে।
পুলোরাম ডিজিজ
পুলোরাম রোগ মোরগ-মুরগীতে একটি ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ। সালমোনেলা পুলোরাম নামক একটি ব্যাকটেরিয়া রোগটির জন্য দায়ী। পুরলারাম ডিজিজ মুলত অনেকটা ফাউল টাইফয়েড এর মতই। এটি একটি ডিম বাহিত রোগ এবং জন্মের আগেই অথবা অব্যবহিত পরে এই রোগের কারণে মৃত্যুহার যথেষ্ট। তবে প্রধানত ৩ সপ্তাহ বয়সের আগের মোরগ-মুরগীতে এই রোগের অক্রমন ঘটে তীব্র আকারে, পক্ষান্তরে বেশী বয়সী মোরগ-মুরগীতে এই রোগের আক্রমন ঘটে মৃদু আকারে ও নির্দিষ্ট অঙ্গে।
লক্ষণঃ তীব্র আকারের আক্রমনের ক্ষেত্রে মোরগ-মুরগীতে ঝিমুনি, শ্বাসকষ্ট, ক্ষুধামন্দা, সাদা আঠালো পায়খানা (ডায়রিয়া) মোরগ-মুরগীর পিছনের পালকে লেগে থাকে। অবশেষে তীব্র পানিশূন্যতার কারণে মোরগ-মুরগী মারা যায়। মৃত্যুর হার ১০০% পর্যন্ত হতে পারে। মৃত বাচ্চার উদর গহবরে ডিমের কুসুম লেগে থাকে।
কম তীব্র আকারের রোগের ক্ষেত্রে বেড়ে উঠা মোরগ-মুরগীতে খোঁড়া পা, অন্থিসন্ধি ফুলে উঠা ইত্যাদি কারণে বৃদ্ধি ব্যহত হয়। মৃদু আকারে এ রোগের আক্রমন হলে অস্থিরতা, বিবর্ণ ও কুঞ্চিত ঝুঁটি, ডিম উৎপাদন, উর্বরতা ও ডিম ফুটে বাচ্চা জন্মের হার হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশ পায়।
গত ২৬/০৬.২০২০ খ্রিঃ তারিখ রোজ শুক্রবার অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত “নতুন রোগ সালমোনেলা মুরগি থেকে ছড়াচ্ছে” “মুরগি থেকে ছড়াচ্ছে নতুন রোগ সালমোনেলা” শিরোনামে কালের কন্ঠ পত্রিকার নিউজ/খবর আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। কোন পত্রিকা বলছে এটি একটি ভাইরাস জনিত রোগ আবার কোন পত্রিকা বলছে এটি একটি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট রোগ।
প্রথমত যারা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের তফাৎ বুঝে না বা জানেন না, আমার মনে হয় এমন অনভিজ্ঞ সাংবাদিকদের পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রির মত এত বড় বিষয় নিয়ে এই ধরনের সংবাদ ছাপানোর কোন যোগ্যতাই তাদের নাই। আমেরিকায় সালমোনেলোসিস রোগ নাকি মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়েছে, একজন মারাও গেছে। এই ধরনের খবর ছাপানোর পুর্বে দেশে যারা পোল্ট্রি এক্সপার্ট আছেন তাঁদের সাথে কথা বলার দরকার ছিল এইমর্মে যে বাংলাদেশে সালমোনেলোসিস রোগ আছে কিনা? থাকলে সেই রোগের প্রাদুর্ভাব কেমন, প্রাদুর্ভাব কি পর্যায়ে আছে? এটা জুনোটিক রোগ কিনা? জুনোটিক রোগ হলে এটা মানুষে কি রোগ সৃষ্টি করে? সেই রোগে মানুষের কোন ক্ষতি হয় কি না? এই রোগটি বাংলাদেশে আগে থেকেই আছে নাকি নতুন এসছে? এই রোগরে কোন টিকা বা চিকিৎসা আছে কিনা? আমেরিকার নিউজ এমন ভাবে ছাপানো হয়েছে শুনলে মনে হচ্ছে আমাদের দেশের নিউজ।
এই রকম ভিত্তিহীন খবর ছাপানোর ফলে জনগণ পোল্ট্রি, পোল্ট্রি জাত পণ্য,ও ডিম খাওয়া ছেড়ে দিলে পোল্ট্রি শিল্পের অবস্থা কি হবে একবার ভেবে দেখেছেন??
এখন সরকারের উচিত এই সকল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আদালতে জনস্বার্থে মামলা করা। উকিল নোটিশের মাধ্যমে কারন দর্শাইতে বলা দরকার। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় ও সচীব মহোদয়গণেরও উচিৎ এর একটা ব্যাবস্থা করা। আমরা ফিল্ড অফিসার, ফিল্ডে কাজ করি।
আমাদের কথার মুল্যায়নই বা কতদুর? বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ কে রক্ষা করার জন্য যেমন ডিএলএস ও ডিএলএস এর কর্মকর্তা/কর্মচারীগণ আছেন, তেমনি পোল্ট্রি শিল্পের ভাল মন্দ দেখার জন্য আছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল(বিপিআইসিসি)। বিপিআইসিসি এর উচিৎ ডিএলএস এর পাশাপাশি প্রকাশিত নিউজের কঠোর প্রতিবাদ করে পোল্ট্রি শিল্পকে ধংশের কবল থেকে রক্ষা করা,এবং আমি সেই কারনেই প্রতিবাদ করার জন্য বিপিআইসিসি কে অনুরোধ জানাচ্ছি।
সালমোনেলোসিস একটি ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা সৃষ্ট রোগ। এরোগ যুগের পর যুগ বাংলাদেশে অবস্থান করছে। আমরা নবাই এতদিন সালমোনেলোসিস রোগের সাথে একত্রে বসবাস করে আসছি। এতদিন তো সামোনেলোসিস দ্বারা কোন মানুষ আক্রান্ত হয়নি? আর যেহেতু ব্যাকটেরিয়াল ডিজিজ তাই এই রোগ নিয়ে কোন মাতামাতির কোন দরকারই নাই। সামান্য পাতলা পায়খানা হলে ঔষধ না খেলেও এমনিতেই সেরে যায়।
আমি সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করছি, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের তীব্র প্রতিবাদ করার জন্য। প্রয়োজনে জনস্বার্থে প্রত্রিকার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা। সাংবাদিকদের এমন উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার যাতে করে ভবিষ্যতে যেন আর এমন নিউজ করার সাহস না পায়।
জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা। করোনা ভাইরাসের প্রচারের মত করে জনগনকে বুঝাইতে হবে যে, সালমোনেলোসিস রোগে মানুষের কোন ক্ষতিই হয়না। মাংস ও ডিম সেদ্ধ করে খেলে তাপে জীবানু ধংশ হয়ে যায়। আপনারা সবাই ভাল থাকবেন, নিরাপদে থাকবেন। নিজে সুস্থ্য থাকুন, পরিবারকে সুস্থ্য রাখুন।
