মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে পদায়নের ক্ষেত্রে এবার বিএনপি ঠেকাও কর্মসূচী হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তার এক সিন্ডিকেট। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই কর্মসূচী বাস্তবায়নের পুরোদমে আয়োজন চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জামায়াতপন্থী অথবা আওয়ামীপন্থী ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে এই পদে পদায়ন দিতে সর্বোচ্চ তদবির চালাচ্ছে সেই সিন্ডিকেট। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে আয়োজন চলছে তাকে ‘বিএনপি ঠেকাও কর্মসূচী’ বলাটাই যুক্তিযুক্ত। তবে এই পদায়নের উদ্দেশ্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। কেননা ভোট কেন্দ্র (শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) থেকে শুরু করে ভোটের দায়িত্বে থাকে শিক্ষার অধিনস্ত শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তারা। বিএনপি ঠেকিয়ে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনে ব্যর্থ হলে জামায়াতপন্থী কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে এই পদে নিয়োগ (পদায়ন) দিতে জোড় প্রচেষ্টা চালাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী এই তিন আমলার সিন্ডিকেট। আর এই তালিকায় সর্বোচ্চ আলোচনায় আছে প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটের একজনের আপন খালাতো বোন।
মন্ত্রণালয়ের এই সিন্ডিকেট প্রভাব বিস্তার করে আট জনের একটি তালিকা চূড়ান্ত করেছে এবং এই আটজনের মধ্যে থেকেই একজনকে ১৯ হাজার শিক্ষা ক্যাডারদের প্রধান পদ মাউশি ডিজির চেয়ারে বসাতে মরিয়া তারা। তবে এই আটজনের থেকেই যে ডিজি হবে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি শিক্ষা উপদেষ্টা। যদিও গত ৬ অক্টোবর ডিজি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে, ‘আগ্রহী প্রার্থীকে সৎ, দায়িত্বপরায়ণ এবং প্রশাসনিক কাজে দক্ষ হতে হবে এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর থাকা আবশ্যক’ ইত্যাদি কথা বলা হয়েছে’। তবে এই সিন্ডিকেট যে আটজনের তালিকা চূড়ান্ত করেছেন তাদের অধিকাংশই বিতর্কিত এবং ফ্যাসিবাদী আওয়ামী আমলের সুবিধাভুগী।
তিন আমলা সিন্ডিকেটের করা তালিকায় প্রথমেই রয়েছেন জয়পুরহাট সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. মো. মাহবুব সরফরাজ। জুলাই গণভ্যুত্থানের আগে তিনি পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন। এই কলেজটি সরকারি কলেজগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান কলেজ। আওয়ামী সরকারের আমলে ডিএনএ টেস্ট করার মত আওয়ামী লীগ করে কি না তা যাচাই বাছাই করে অধ্যক্ষ পদে পদায়ন দেওয়া হতো। এছাড়াও তিনি আওয়ামী আমলে একাধিক কলেজে অধ্যক্ষ এবং প্রধান প্রধান কলেজে পদায়ন ছিলেন।
তালিকায় দুই নম্বরে থাকা অধ্যাপক রায়হানা তছলিম যিনি ৯টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের এই নেত্রী আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অদ্যাবধি শিক্ষা ভবনে পদায়ন আছেন। কোটি কোটি টাকা লুটপাট করার অভিযোগে একাধিকবার শিরোনাম হয়েছেন গণমাধ্যমে। তার স্বামী শিক্ষা ক্যাডারের আরেক জাবিয়ান ছাত্রলীগ নেতা সেলিম মিয়া (বর্তমান পিআরএলএ) যিনি মাউশির মনিটরিং এন্ড ইভালুয়েশান উইংয়ের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন। পরবর্তীতে পাঁচ আগস্টের পর ধামরাই কলেজের অধ্যক্ষ পদে থেকে পিআরএলএ যান। শিক্ষা ক্যাডারের আলোচিত এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী এই দম্পতি আওয়ামী প্রভাবশালী ও সাবেক ছাত্রলীগের নেতা-নেত্রী হওয়ায় শিক্ষা অধিদপ্তরের রাম রাজত্ব কায়েম করেছিলো। হাসিনার পতনের পরে সেলিম মিয়া পরিচালক পদ হারালেও তার স্ত্রী রায়হানা তসলিম এখনও আছেন বহাল তরিয়াতে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটের একজনের আপন খালাতো বোন সে। ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি এই পদে টিকে আছেন খালাতো বোনের সেই নোয়াখালী সিন্ডিকেটে। এই সিন্ডিকেটই এখন তাকে মাউশির ডিজি বানাতে মরিয়া। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মুখে মুখে মহাপরিচালক পদের জন্য ১৬ ব্যাচের কর্মকর্তাদের সুযোগ দেওয়ার পেছনে এই খালাতো বোনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এই কর্মকর্তা। বিগত ফ্যাসিষ্ট আমলে তদানিন্তন অফিসার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ সাহেবের প্যানেল থেকে নির্বাচন করলে তার ব্যক্তিচরিত্রের জন্য বিপুল ভোটে হেরে যান তিনি। নোয়াখালী কোটার সিন্ডিকেট খালাতো বোন কোটা এখন তাকে ডিজি পদে আসীন করার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন।
এরপরের তালিকায় আছেন, নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মোসতাক আহমেদ ভুইয়া। যিনি শেখ হাসিনা আমলের প্রভাবশালী মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেনের সহোদর ছোট ভাই। ভাইয়ের প্রভাবে প্রভাবশালী শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা তিনি। দীর্ঘদিন ধরেই আছেন নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে পদায়ন। জুলাই গণভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিস্টদের সহযোগিদের পদ হারালেও তিনি এই আমলেও প্রভাবশালী হওয়ায় তার আগের চেয়ারেই বহাল আছেন তিনি। পাঁচ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা তাকে প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করলেও সাবেক সচিব সিদ্দিক জুবায়েরের প্রভাবে তাকে আর বদলি হতে হয়নি। আওয়ামী প্রভাবশালী বলয়ে তিনি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সহ প্রায় পুরো সময়টাই শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ছিলেন। চাকরীর শেষ জীবনে নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে পদায়ন নিয়ে এখন সেখানেই আছেন তিনি।
প্রফেসর শামীম আহসান খান (মৃত্তিকাবিজ্ঞান) বরিশালের আবুল কালাম কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ। পাঁচ আগস্টের পরে তিনি জামায়াতে ইসলামের তদবিরে এই পদে পদায়ন পান। আওয়ামী আমলে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন ছিলেন। তার বিরুদ্ধে সাত টি চেকের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সাত কোটি টাকার অবৈধভাবে লেনদেন করার কারণে বিভাগীয় মামলা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০২১ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীন “কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি)” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর ক্যাম্পাসে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় অনার্স/মাস্টার্স কলেজের শিক্ষকদের ৬ষ্ঠ হতে ১২তম (০৭) ব্যাচের প্রশিক্ষণ ব্যয় হতে ৭ (সাত)টি চেকের মাধ্যমে প্রায় সাত কোটি টাকার অনিয়মের দায়ে এই প্রকল্পের তৎকালীন সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার (স্ট্র্যাটিজিক প্ল্যান) প্রফেসর শামীম আহসান খানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এ মামলায় শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে। তবে আওয়ামী ছত্র ছায়ায় তদন্তকে প্রবাহিত করে সেই মামলা থেকে খালাস পেতে সক্ষম হোন এই কর্মকর্তা। পাঁচ আগস্টের পর জামায়াতের তদবিরে অধ্যক্ষ পদে পদায়নের পর সেই একই তদবিরে শিক্ষা ভবনের ডিজির দৌড়ে এগিয়ে আছেন তিনি।
অধ্যাপক এ.বি.এস.এ.সাদী মোহাম্মদ কবি নজরুল সরকারি কলেজের ভূগোলের বিভাগীয় প্রধান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ১৬ ব্যাচের ছাত্র ও বিসিএস ১৪ ব্যাচের কর্মকর্তা। ঝিনাইদহের সন্তান অধ্যাপক সাদী ছাত্র জীবনে শিবিরের নেতা হলেও বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের নেতা হিসেবে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়েছেন। বিএনপি-জোট সরকারের আমলে ২০০১ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত যশোর সরকারি সিটি কলেজে চাকরি করলেও শেখ হাসিনার আমলের পুরোটা সময় ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন কলেজে পদায়ন ছিলেন। বর্তমানে তার পুরাতন সংগঠন জামায়াতে ইসলামী তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। তিনি জামায়াতে ইসলামের তদবিরে মাউশির ডিজি পদে অন্যতম আলোচনায় আছেন।
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রাজ্জাক দিনাজপুর সরকারি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ। পাঁচ আগস্টের আগে ছিলেন একই কলেজের উপাধ্যক্ষ। পাঁচ আগস্ট পরবর্তীতে তিনি এই পদে আসীন হয়। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ছত্রছায়ায় তিনি দীর্ঘদিন পদায়ন ছিলেন দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সচিব পদে। কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ সব পদে পদায়ন ছিলেন তিনি। আগামী মাসের ২০ তারিখে তার পিএআরএল এর সময় হলেও শক্ত লবিং থাকায় তিনিও শর্ট লিস্টে নাম লেখাতে পেরেছেন। আওয়ামী বলয়ের এই কর্মকর্তা হাসিনা সরকারের অন্যতম সুবিধাভুগী বলছেন শিক্ষা ক্যাডারের হাসিনার আমলের বঞ্চিত কর্মকর্তারা।
অধ্যাপক ড. ছদরুদ্দিন আহমদ সরকারি তিতুমীর কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ। “অসদাচরণ” ও “দুর্নীতি” অভিযোগে বিভাগীয় মামলা এবং মন্ত্রণালয়ের করা তদন্তে “অসদাচরণ” ও “দুর্নীতি” প্রমাণিত হওয়ায় ড. ছদরুদ্দিনের ২ বছরের ইনক্রিমেন্ট বন্ধ এবং ৩ বছর পদোন্নতি বন্ধ থাকার শাস্থি হলেও তথ্য গোপন করে জামায়াতে ইসলামের কোটায় ৫ আগষ্টের পর সিদ্দিক জোবায়ের তাকে তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ পদে পদায়ন করেন। কর্মজীবনে নানা অপকর্মের সাথে জড়িত থাকা এই কর্মকর্তা জামায়াতে ইসলামীর হাত ধরেই ডিজি পদে মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছেন। আশা দেখছেন জামায়াতে ইসলাম তাকে এই চেয়ারে বসাতে সক্ষম হবেন।
অধ্যাপক ড. মেহেরুন নেছা। রাজধানীর অন্যতম নারী শিক্ষার্থীদের বিদ্যাপীঠ বেগম বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বিসিএস সাধারণ শিক্ষার ১৪ ব্যাচের এই কর্মকর্তা ছাত্র জীবনে ছাত্রশিবিরে সাথী ছিলেন। তার স্বামী ড. সাইয়েদ আলী ছাত্র জীবনে শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক শের-ই-বাংলা কৃষি কলেজ) ছাত্র শিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন। বর্তমানে কৃষি সম্পসারণ বিভাগের পরিচালক (বিজ) হিসাবে কর্মরত। পারিবারিকভাবে জামায়াতের রাজনীতিতে জড়িত থাকা এই কর্মকর্তাকেও ডিজির চেয়ারের জন্য লবিং করছেন দলটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। সেই তদবিরেই বাছাই কমিটিতে স্থান করে ডিজি পদের মৌখিক পরীক্ষাও দিয়েছেন তিনি।
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা বলছেন, যে চূড়ান্ত তালিকায় যাদের কথা শোনা যাচ্ছে তারা অধিকাংশই ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সুবিধাভুগী ও মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি মতে সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা নন। এদের মধ্যে থেকে দেওয়া হলো ভঙ্গুর মাউশির অবস্থা একেবারে অচল হয়ে যাবে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর পর আওয়ামী লীগের ভোল্ট পাল্টিয়ে এন্ট্রি আওয়ামী লীগ সাজার চেষ্টা করা, শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে অধ্যক্ষ পদ থেকে প্রত্যাহার হওয়া ও বরিশাল সিটির সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ অনুচর হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ড. এহতেসাম উল হককে মাউশির মহাপরিচালক পদে পদায়ন করা এবং আন্দোলনের মুখে প্রত্যাহার করা এসব থেকে মন্ত্রণালয় যদি শিক্ষা না নেয় তাহলে একই পরিণতি হবে। আগের সিন্ডেকেটের পথ ধরে বর্তমান সিন্ডিকেটও একই পথে হাটছেন বলে মনে হচ্ছে। বিষয়টি শিক্ষা উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।
ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষা ক্যাডারের ১৪ ও ১৬ ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তি দিলো সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে অথচ তারা যাচাই বাছাই করে সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের তালিকা চূড়ান্ত করলো এটা কি তামাশা নয়? শিক্ষা ক্যাডারদের কী মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাদের ব্যক্তিগত কর্মচারী মনে করে? আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে ফের শিক্ষা প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে তার দায় শিক্ষা উপদেষ্টা এবং সচিবকেই নিতে হবে। বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বিএনপিপন্থীদের বাইপাস করার চেষ্টা চলছে তা সত্য। তবে বিতর্কিত কাউকে দিলে মাউশির অচলাবস্থার অবসান তো হবেই না বরং সংকট আরও বাড়োবে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, মাউশির ডিজি পদে নজিরবিহীন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কারণ এমনটা আগে কখনও কোনো দপ্তরে দেখা যায়নি। এই পদে পদায়ন হয় নিয়োগ না।তারা বলছেন, মহাপরিচালক পদে নিয়োগে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরারের নেতৃত্বে ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাহলে এই কমিটি কি করছে। এই কমিটি কি মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি ? তা না হলে চূড়ান্ত তালিকায় কিভাবে বিতর্কিতরা স্থান পায়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টাকে দেখার আহবান জানান তারা।
এর আগে গত ৬ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দিতে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ১৬তম এবং তদূর্ধ্ব ব্যাচের কর্মকর্তাদের আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্তসহ অফলাইনে আবেদন করার জন্য বলা হয়।
তবে, মহাপরিচালক পদে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ আজাদ খান কর্মরত থাকাবস্থায় নজিরবিহীনভাবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তারা বলছেন, ডিজি পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় এমন বিজ্ঞপ্তি নজিরবিহীন এবং শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাসে প্রথম। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পরই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে শিক্ষা সচিব বরাবর আবেদন করেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান। এর এক সপ্তাহ পরেই তাকে ওএসডি করা হয়।
তার আগে গত বছরের ডিসেম্বরে মাউশি মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অধ্যাপক এ বি এম রেজাউল করীম। তিনি অবসরে যাওয়ার পর গত ৩০ জানুয়ারি এ পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন রসায়নের অধ্যাপক এহতেসাম উল হক। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর পর আওয়ামী লীগের ভোল্ট পাল্টিয়ে এন্ট্রি আওয়ামী লীগ সাজার চেষ্টা করা, শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে অধ্যক্ষ পদ থেকে প্রত্যাহার হওয়া ও বরিশাল সিটির সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ অনুচর হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ড. এহতেসাম উল হককে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্বে) হিসেবে পদায়ন পান অধ্যাপক এহতেসাম উল হক। এ নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি ডিজি পদে পদায়ন পাওয়ার পরে ‘শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে প্রত্যাহার হওয়া ব্যক্তিই মাউশির নতুন ডিজি‘ শিরোনামে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠে। এরপর বিএনপির শিক্ষক সংগঠন শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট ধারাবাহিক আন্দোলন শুরু করে ডিজির প্রত্যাহারের দাবিতে। পরে দাবির মুখে নিয়োগ দেওয়ার মাত্র ২০ দিনের মাথায় সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। পরবর্তীতে জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুহাম্মদ আজাদ খানকে মাউশির নতুন মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) করা হয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি ডিজি পদের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
