ময়মনসিংহ, রবিবার, ২৯শে নভেম্বর, ২০২০ | ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ () ৩০°সে
শিরোনাম :
হালুয়াঘাটে সাংসদ জুয়েল আরেংকে সংবর্ধনা জুয়েল আরেং যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়ায় হালুয়াঘাটে আনন্দ মিছিল জুয়েল আরেং যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়ায় হালুয়াঘাটে আনন্দ মিছিল হালুয়াঘাটে গড়ে উঠছে অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পট হালুয়াঘাটে বহুল প্রতীক্ষিত ভারতীয় কয়লা আমদানি শুরু ময়মনসিংহে চুরি চিনতাই মাদকরোদে বিট পুলিশ সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হালুয়াঘাট সাধারণ পাঠাগারের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন চুরি চিনতাই ও মাদকরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মহড়া জকিগঞ্জে আল ইসলাহ ও তালামীযের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ ময়মনসিংহে জেলা ও মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কমিটি গঠন

খ্রীষ্টীয় ভাবধারায় গারোদের ওয়ানগালা উৎসব

সিস্টার তৃপ্তি দ্রং ও সিস্টার মঞ্জু জেংচাম: যাকে আজকের খ্রীষ্টবিশ্বাসী গারোরা এক উপাস্য ঈশ্বর বলে স্বীকার ও বিশ্বাস করে তাঁকেই আনি-আফিলফা ‘মিসি সালজং’ বলে অভিহিত করেছিলেন কিনা তা জানা যায়নি। তবে গারোদের পূর্বপুরুষ বলে পরিচিত আনি-আফিলফা, মিসি সালজং পবিত্র বাইবেলে কথিত কাইন ও আবেলের কাহিনী জানত কিনা জানিনা। একথা স্পষ্ট যে, বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্তে¡র আবেল ও কাইনের কাহিনী এবং ওয়ানগালা উৎসবের সূচনা কাহিনী দুটোই এক দিকে সত্য-সুন্দরের ইঙ্গিত দান করে। খ্রীষ্ট বিশ্বাস মতে যা কিছু সত্য সুন্দর তাই গ্রহণীয় ও অনুসরণীয়। যে যেই সংস্কৃতির লোক হোক না কেন, সে সেই সংস্কৃতি নিয়েই একজন খ্রীষ্টের অনুসারী হতে পারে। যাকে বলা হয় সংস্কৃত্যায়ন।

মন্ডলী যেখানে স্থানীয় সংস্কৃতির বিশ্বাস ও জীবনধারার আলোকে খ্রীষ্টকে লালন করে। যাকে বলা যায় ‘খাপ খাওয়ানো’। দ্বিতীয় ভাটিকান মহাসভার উদ্দেশ্য হলো-‘ঈশ্বরের প্রেমপূর্ণ বাণী ছড়িয়ে দেওয়া’ এবং ‘মন্ডলীর প্রৈরিতিক কাজের অগ্রগতি সাধন করা। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তৎকালীন আর্চবিশপ টি.এ. গাঙ্গুলীর অনুপ্রেরণায় কয়েকজন পুরোহিত, সিস্টার (নান) এবং জনগণকে সঙ্গে করে একটি উপাসনা সাব-কমিটি গঠন করা হয়; যার মূল উদ্দেশ্য ছিল- গারো সংস্কৃতি, রীতি-নীতিকে তারা যেন চর্চা করে এবং তাদের মূল বিশ্বাসকে যেন তারা খ্রীষ্টীয়করণ করে। তাই বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়ানগালা অনুষ্ঠানের অংশগুলো যাচাই করে তা খ্রীষ্টিয়করণ করা হয়েছে। এই কারণেই সংস্কৃতায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্যাথলিক মন্ডলী ব্যাপক অনুসন্ধান এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গারোদের ওয়ানগালা উৎসবকে শ্রেষ্ঠ উৎসব হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে তা পালনের জন্যে উৎসাহ প্রদান করে।

গারোদের উৎপত্তি এবং তাদের আদিনিবাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করা প্রায় এক অসম্ভব ব্যাপার। কারণ এই কাজের জন্য কোন লিখিত তথ্য প্রদান কিংবা ধারাবাহিক কোন প্রমাণ নির্ভর ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে নৃ-বিজ্ঞানীদের মতে, গারোরা প্যালিও মংগোলীয় শ্রেণীভূক্ত তিব্বতী বর্মণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত এবং তাদের আদি নিবাস বর্তমান চীনের উত্তর পশ্চিম এলাকায় সিন্-কিয়াং প্রদেশে। খ্রীষ্টপূর্ব সাড়ে সাত হাজার বছর আগে তাঁরা ভারত বর্ষে বসতি স্থাপন করে। সেই সময় ঐ দেশে জমি অনুর্ভর হয়ে পড়ে এবং চাষাবাদ করলেও ফসল ফলতো না। তাই নতুন দেশের সন্ধান করতে করতে এদেশে আগমন করে। সেই সময় এদেশ বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিলো।

কোন জনমানব ছিলনা এখানে। পাহাড় পর্বত এলাকাকে বেছে নিয়ে গারোরা জুম চাষ করে জীবীকা অর্জন করতো। গারোরা নিজেদেরকে ‘গারো’ নামে পরিচয় দিতে পছন্দ করে না। তাদের ধারণা গারো নামটি অন্যদের দেয়া এবং সেটি শ্লেষাত্মক শব্দ। তবে গারো নামের উৎপত্তি কখন, কিভাবে এবং কাদের দেয়া তা অদ্যাবধি সঠিকভাবে জানা যায়নি। অনেকের মতে গারো পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তে বর্তমান বাংলাদেশের সীমানার কাছাকাছি এক সময়ে গারোদের অন্যকম দল গারা-গানচিংদের ব্যাপক বসতি ছিল এবং তৎকালীন বঙ্গদেশের বাঙালি অধিবাসীরা তাদের সঙ্গেই প্রাথমিক পরিচিতি লাভ করে, যার ফলে বাঙালিরা ঐ দলের নামানুযায়ী সবাইকে সম্বোধন করতে থাকে আর কালক্রমে সম্বোধনটি গারোতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

অপর দিকে অনেকের ধারণা বৃটিশ শাসনামলে সীমান্তবর্তী হিন্দু জমিদাররা যখন গারোদের বশ্যতা আদায়ের লক্ষ্যে সমতল এলাকায় অবস্থিত সাপÍাহিক হাটগুলোতে গারোদের আগমন বন্ধ করে লবণসহ তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর সরবরাহে বিঘœ সৃষ্টি করতো তখন পাহাড়ি গারোরা প্রতিশোধ গ্রহণকল্পে সীমান্তবর্তী সমতল অঞ্চলে অতর্কিতে সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে তান্ডব সৃষ্টি করে পলায়ন করতো। এভাবে দিনের পর দিন গারোরা দুর্দমনীয় বেগে সীমান্ত এলাকার জমিদারদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতো। ফলে হিন্দু জমিদাররা তাদেরকে ‘ঘারুয়া’ (দুর্বিনীত, জেদী, একরোখা) জাত নামে অভিহিত করতো এবং কালক্রমে উক্ত ঘারুয়াই গারু হতে গারোতে রূপান্তরিত হয়। গারো নামকরণে আরো অন্য কারণও থাকতে পারে, তবে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় গারো নামটি অন্যদের দেয়া। গারোরা কিন্তু কোন দিনই নিজেকে গারো নামে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ  বোধ করেনি এবং এখনো করেনা।

তারা নিজেরা নিজেদেরকে ‘আচিক মান্দি’ (পাহাড়ের মানুষ) কিংবা সংক্ষেপে ‘আচিক’ অথবা ‘মান্দি’ বলে পরিচয় দিতেই পছন্দ করে। তাদের ধারণায় গারো নামটি অন্যের চাপিয়ে দেয়া এবং শ্লেষাত্মক শব্দ বিধায় গারোদের কাছে আপত্তিকর ও সেই সঙ্গে অবমাননাকর। রেভা: ফাদার হোমারিক এর মতে, কেউ জানেনা গারোরা বাংলাদেশে কখন এসেছিল। তাদের বাসস্থান তিব্বত ত্যাগেরও কোন সঠিক তথ্য নেই। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৃটিশদের দেওয়া তথ্যনুযায়ী, ভারতের গোপালপুর জেলার পাহাড় বেষ্টিত সমতল ভূমিতে গারো পাহাড়ের উত্তর এবং পশ্চিম সীমান্তবর্তী এবং দক্ষিণে ময়মনসিংহ জেলায় গারোদের প্রথম বাস করতে দেখা যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, টাঙ্গাইল, গাজিপুর, ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় আংশিক বাস দেখা যায়। তবে বর্তমানে ভারতের মেঘালয় রাজ্যকেই মূল বাসভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। গারো উইকীপিডিয়ার তথ্য মোতাবেক এদেশে  প্রায় ২,৬০,০০০ জন গারো আদিবাসী বসবাস করে। যাদের মধ্যে ৯৮% ভাগই খ্রীষ্ট-বিশ্বাসী। গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। এই সমাজ ব্যবস্থায় পারিবারিক বিষয় সম্পত্তির অধিকারী মেয়েরা এবং পরিবারে একজনকে মেয়েদের মধ্য থেকে নকনা (ঘরের জন্য) নির্বাচিত করা হয়। পরিবারের ছেলে মেয়েরা মায়ের পদবী অর্থাৎ উপ-গোত্রে পরিচিত হবে। অতীতে প্রতিটি গারো পরিবার একেকটি যৌথ পরিবার ছিল। স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী এমনকি স্ত্রীর দাদু-দিদিমা সমন্বয়ে পরিবার গঠিত হতো। গারোদের সামাজিক অনুভূতি ছিল অত্যন্ত গভীর।

তারা তাদের সামাজিক জীবন ও লোকাচারকে কেবলমাত্র ব্যক্তি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবেই মনে করতো না, বরং এটিকে অলংঘনীয় জীবন বিধান হিসেবে মনে করতো। আদিতে তারা প্রকৃতি পূজারী ছিল। প্রকতির মাঝে যেসব প্রবল শক্তির উপস্থিতি তারা গভীরভাবে অনুভব করতো সেসব প্রবল শক্তি গুলোকেই তারা দেবদেবী হিসেবে গ্রহণ করতো এবং তাদের সন্তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্যেই পূজা-অর্চনা করতো। এর পাশাপাশি তারা সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সবসময় বিশ্বাস করতো। কারণ তার বিষয়ে তাদের বিশ্বাস আদিধর্মে বিদ্যমান। তারা একই সঙ্গে মানবদেহে আত্মার অস্তিত্বেও বিশ্বাসী, সেই সাথে আত্মা যে অবিনশ্বর এটাও তারা মানত এবং জন্মান্তরবাদেও বিশ্বাস করতো। গারোরা নিজ এলাকায় স্বাধীনভাবেই কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো।

ভাল ফসলের জন্য তারা বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন দেব- দেবীর কাছে পূজা-অর্চনা করতো। আদিতে তারা বিশ্বাস করতো দেব-দেবীরা ফসল ফলাতে এবং বেঁচে থাকতে সাহায্য করে; সুতরাং সেই সকল দেব-দেবীদের সন্তুষ্ট করতে জুমের প্রথম ফসল ও প্রথম পশু শাবকটি উৎসর্গ করতো। এই নৈবেদ্য উৎসর্গ অনুষ্ঠান উদ্যাপিত হতো বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বেশির ভাগ অনুষ্ঠানই জুম চাষকে কেন্দ্র করে পালিত হতো। অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রধান ছিল রংচু-গালা (চিরা ফেলা অনুষ্ঠান), আহাওয়া, আগাল মাক্কা, ওয়ানগালা এবং রিংসালদং (গারোদের বিশেষ অনুষ্ঠান)। এ অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওয়ানগালা উৎসবটি খুব জাঁকজমকভাবে পালিত হতো।

জুম চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে ক’টি সামাজিক উৎসব রয়েছে তার মধ্যে ওয়ানগালাই সর্বশেষ এবং সর্ববৃহৎ উৎসব। জুম ক্ষেতের সমস্ত ফসল তোলা হলে এক একটি গ্রাম অথবা কয়েকটি গ্রাম একত্রে ওয়ানগালা উৎসব উদ্যাপন করে থাকে। যার শাব্দিক অর্থ হলো ‘ওয়ান’ মানে কোন নৈবেদ্য এবং ‘গালা’ মানে দেওয়া বা উৎসর্গ করা; অর্থাৎ একত্রে ওয়ানগালা হলো দেবতার নামে কোন কিছু নৈবেদ্য উৎসর্গ করা। আবার অকেকে এটাও বলে থাকেন- আন’আ চিন’আ ও গালা, এ তিনে মিলে ওয়ানগালা। অর্থাৎ পাতা পাত্রে নৈবেদ্যর বস্তু রেখে পানীয় (মদ বা চু) ঢেলে দেবতার উদ্যেশে উৎসর্গ করা। সাংসারেক গারোদের মতে, প্রধান দেবতা ‘তাতারা-রাবুগা’-র নির্দেশমতেই দেব-দেবী অর্পিত দায়িত্ব অনুসারে উদ্ভিদ, বস্তু ও প্রাণী সৃষ্টি করেছিলেন। সমুদয় সৃষ্টির পর ‘মিসি সালজং’ দেবতা অগণিত অনুচর সংগে নিয়ে পৃথিবী পরিদর্শনে এসেছিলেন। তখনও মাটি শক্ত রূপ ধারণ করতে পারেনি।

নদী-নালার প্রবাহ ছিল এলোমেলো। জলাবদ্ধতা মাটির নরম অংশকে আরও তুলতুলে করে রেখেছিল। এই অবস্থা পরিবর্তন করার জন্য তিনি নদী-নালার সৃষ্টি করেছিলেন। সাথে পানি চলাচলের প্রবাহকে গতিশীল করে কৃঙ্খলায় নিয়ে আসলেন। পাহাড়-পর্বতের উপর কঠিন পাথর, বন-বনানী, আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য সৃষ্টি করে প্রয়োজন মাফিক প্রাণীর সমাগম ঘটালেন। এরপর পৃথিবী মনোরম ও বাসযোগ্য হয়ে উঠল । কথিত আছে যে, পরবর্তী সময়ে কোন এক শুভ মুহূর্তে ‘মিসি সালজং’ (শস্য ও উর্বরতার দেবতা) দেবতার সাথে এক সহজ-সরল নিরীহ মান্দি (গারো) নারীর দেখা হয়। তার সাথে ‘মিসি-সালজং’- এর সাক্ষাৎকালে তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় হয়। সেই নারী ছিল বিধবা, তার একজন মেয়ে ছিল। নারীটির নাম ছিল, ‘আইসেগ্রেসি’। তার জীবনে দরিদ্রতা ছিল নিত্য সঙ্গী।

বাড়ি ঘর তৈরি করার মত তার কোন পুরুষ লোক ছিলনা। তাই কোন রকম ঘর তুলে শুকনো কলা-পাতার ছাউনি দিয়ে, বুনো লতা-পাতার বেড়া তৈরি করে দিন যাপন করতেন আইসেগ্রেসি। ‘মিসি সালজং’ দেবতা আইসেগ্রেসিকে বললেন, আমি আজ তোমার বাড়িতে থাকবো। আইসেগ্রেসি অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে বললেন, আমি এক দুঃখী বিধবা নারী, বাড়ি-ঘর বলতে কিছুই নেই। শুকনো কলা পাতার ছাউনি আর বুনো লতা-পাতা দিয়ে বেড়া তৈার করে কোনরকম দিন যাপন করছি। এই ঘর আপনার মত সম্মানিত অতিথির থাকার জন্য যোগ্য হতেই পারে না। মিসি সালজং তার অন্তরের সরলতা দেখতে পেয়ে বললেন, আমি তোমার বাড়িতেই রাত্রি যাপন করব। তুমি বিধবা অবস্থায় অত্যন্ত দুঃখে দিনযাপন করছ, তা আমার হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। তুমি আমার সম্মুখে শুধুমাত্র ধুপ জ্বালিয়ে দিও, তাহলেই আমি সšুÍষ্ট থাকবো। আর বিধবা নারী আইসেগ্রেসি সেই দেবতা মিসি সালজং-এর সামনে ধুপ জ্বালিয়ে সম্মান দেখালেন। মিসি সালজং তার ঘ্রাণ নিয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন।

মিসি তার আপ্যায়নে খুশি হয়ে তাকে ধান, কাউন, রাং এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ধন-দৌলত দান করে আর্শীবাদ করলেন। মিসি সালজং বিধবা আইসেগ্রেসিকে শস্য বপনের পদ্ধতিও শিখিয়ে দিলেন। তারপর মিসি সালজং বিধবা আইসেগ্রেসিকে বললেন, আমার শিক্ষানুসারে শস্য রোপনের প্রথম বছর, যখন প্রথম ফসল উঠবে তখন আমি তোমাদের কাছে আবার ফিরে আসবো। নতুন ফসল পাওয়ার আনন্দ উৎসব উপলক্ষ্যে তোমরা আমাদের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য উৎসর্গের অনুষ্ঠান করবে। সেদিন ধুপ-ধুণা জ্বালিয়ে আমাদের দেবতাদের সম্মান জানাবে।

সেই দিন হবে আনন্দের দিন, খাওয়া-দাওয়ার দিন এবং নাচে-গানে ভরে উঠবে তোমাদের গারো সমাজ। গারো সমাজ সেই দিনের নাম দিলেন ‘ওয়ানগালা’। এক বছর আগে যা বলেছিলেন সেই কথামত ফসল প্রাপ্তির সময় হলে ‘আনি আফিলফা, চিনি গালাফা’র দেবতা মিসি সালজং উপস্থিত হলেন আইসেগ্রেসির এলাকায়। এই দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর উদ্দেশ্যে আইসেগ্রেসি ও তার লোকজন মংরে পাহাড়ে নতুন ফসল, চু (তরল পানীয়) ও ধুপ-ধুণা দিয়ে এক নৈবেদ্য উৎসর্গ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। এভাবেই ‘ওয়ানগালা’ উৎসবের সূচনা হয়। সেদিন পূর্বের কথামত সেই এলাকা আনন্দ উৎসবের সুবাতাসে ভরে উঠল। খাওয়া-দাওয়া, নাচ-গান ও আনন্দ উল্লাসে ভরে উঠল তাদের সকলের অন্তর। সেই সুখবরটি ধীরে ধীরে গোটা গারো সমাজে ছড়িয়ে পড়ল।

এমনভাবে দীর্ঘ সময়, যুগ যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অতিবাহিত হলেও গারোরা সাংসারেক ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে টিকে ছিল। আর ‘ওয়ানগালা’ কেই প্রতি বছর প্রধান উৎসব বলে পালন করে আসছিল। খ্রীষ্ট ধর্মের পূর্বে গারো জাতির ধর্মের নাম ছিল ‘সাংসারেক’ যার অর্থ দাড়াঁয় সনাতনী ধর্ম। সাংসারেক ধর্মের মূল শক্তি ছিল অগণিত দেব-দেবতা। সেই কিছু সংখ্যক দেব-দেবীদের শর্ত পূরণ করে সন্তুষ্টি প্রদান করা এবং আর্শীবাদ লাভ করাই ছিল‘ ওয়ানগালা’ উৎসব পালনের মূল উদ্দেশ্য। উল্লেখযোগ্য যে, সেসব দেব-দেবীদের নাম হলো-১. ‘তাতরা-রাবুগা’-প্রধান দেবতা, ২. মিসি সালজং- শস্য ও উর্বরতার দেবতা, ৩. রবিমেমা- শস্যের দেবতা, ৪. সুসিমে- শস্য রক্ষাকারী ও ঐশ্বর্যের দেবতা, ৫. সালবারিয়া- শস্য ও বায়ুর দেবতা, ৬. গয়রা- আকাশস্থ বজ্রের দেবতা, ৭. নস্তু-নপান্ডু- মেঘ ও জলের দেবতা, ৮. সালজং- শক্তি, সাহস ও অনুপ্রেরণার দেবতা, ৯. চুরাবত্তি- পৃথিবী পর্যবেক্ষণ দেবতা।

সনাতনী গারোদের বর্ষপঞ্জিকার অষ্টম মাস আনিজা-এর (অক্টোবরে) শেষে কিংবা নভেম্বরের প্রথম দিকে এই ‘ওয়ানগালা’ উৎসব উদ্যাপিত হতো। তবে এই উৎসবের জন্য সার্বজনীন কোন তারিখ নির্ধারিত ছিলনা। তারিখ নির্ধারণ গ্রামভেদে সংনি নকমা অর্থাৎ গ্রাম প্রধানের উপর অনেকটা নির্ভর করতো। ঘরে ফসল তোলা হলে গ্রাম প্রধান গ্রামবাসী সকলকে নিয়ে পানাহার করতেন এই পানাহারেই ওয়ানগালার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা করা হতো। তারিখ ঘোষণার পর তাদের মধ্যে প্রস্তুতির সাড়া পড়ে যায়। ধনী-গরীব সবাই চু (বিশেষ পানীয়) প্রস্তুত করে; হাট-বাজার করে গরু, শুকর, মোরগ, বাসন-কোসন প্রভৃতি ক্রয় করে উৎসব প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকে।

এছাড়াও পরিবার পরিজনদের জন্যে নতুন কাপড়- চোপড়ও ক্রয় করে। প্রস্তুতি হিসেবে গ্রামের পথ-ঘাট ও বাড়ী-ঘর মেরামত ও পরিস্কার করে থাকে। অন্যান্য গ্রাম থেকে যেসব অতিথি আসবে, তাদের থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা করে ফেলে। ওয়ানগালার পূর্ব দিনে গ্রামবাসীরা কোথাও যায় না, কোনো কাজও করে না, তারা দিনটি পবিত্রভাবে কাটিয়ে দেয়। পাহাড়াঞ্চলে যুবকেরা নকপান্থেতে (কাছাড়ী ঘর যেখানে যুবকেরা থাকে) সান্ধ্য  ভোজের আয়োজন করে। সবাই তাতে শামীল হয়। সাধারণত মহিলা ও ছেলে-মেয়েরা নকপান্থের ভিতরে ঢুকে না। তারা নকপান্থের সামনে উঠানে বসে। সবাইকে ভোজে আপ্যায়নের পর নকপান্থের যুবকেরা বাদ্য-যন্ত্রগুলো বাজিয়ে ওয়ানগালার নাচ-গানের মহড়া দেয়। ওয়ানগালা অনুষ্ঠানটি দুটো অংশে পালিত হয় Ñ ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে।

প্রথমটি কামাল (ধর্ম যাজক) দ্বারা সম্পন্ন করা হয়, দ্বিতীয়টি নাচ, গান, খেলা, বিশেষ করে বাহ্যিক আনন্দের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের নাম চু-রুগালা। এখানে ‘চু-রুগালা’-র অর্থ হচ্ছে ‘ বিশেষ পানীয় ঢালা অনুষ্ঠান’। এ অনুষ্ঠানটি রাত্রে উদ্যাপিত হয়। জুম ক্ষেতের ভাগ্য দেবীর উদ্দেশ্যে নূতন ধানের চিড়া উৎসর্গের মাধ্যমে এ অনুষ্ঠানের শুরু হয়। এ দিনে ভোর বেলায় নকমা আ’সিরকা স্থানে যান এবং সালজং দেবতার পূজা করেন। দুপুরের দিকে তিনি বাড়ি ফিরেন। বহু লোক সমবেত হলে দুপুরের পরে তিনি প্রথমে ভান্ডার দেবী ও গৃহ দেবতার পূজা করেন। পরে ঘরের মালজুরীতে সাজানো নতুন শস্য, শাক-সবজি, কৃষি যন্ত্রপাতি ও বাদ্যযন্ত্রগুলোর উপর মদ ঢেলে সালজং দেবতার উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য উৎসর্গ করেন।

পরে পর্যায়ক্রমে গ্রামের সবার বাড়ীতে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। চু-রুগালা অনুষ্ঠানের পর নকমার ঘর সাজানো হয়। প্রতিটি বাড়ির মহিলারা চালের গুড়ি প্রস্তুত করতে সাহায্য করে এবং তা দিয়ে আঠালো জাতীয় দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নকমার ঘরের খুটিগুলোর মধ্যে চালের গুড়ির আঠা দিয়ে আঙ্গুলের ছাপ দেয়া হয়। এভাবে নকমার ঘর সাজানোর পর যুবকেরা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে একইভাবে সাজাতে বেড়িয়ে পড়ে। চালের গুড়ি শুকিয়ে গেলে ঘরের সমস্ত খুঁটিগুলো সুন্দর সাদা দেখা যায়। কয়েক মাস গত হলে তা হলুদ বর্ণ ধারণ করে কিন্তু কখনও বিলীন হয়ে যায় না। দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানের নাম সাসাৎস’ওয়া বা ‘ধুপ জ্বালানো দিবস’। ‘ সাসাৎ’ হচ্ছে গাছের ছাল এবং ‘সআ’ হচ্ছে পুড়ানো বা জ্বালানো। অর্থাৎ যে গাছের ছাল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলে সুগন্ধ ছড়ায় তেমন গাছের ছালকে এ দিনে ধুপ রূপে জ্বালানো হয়। নকমা নিজে তার ঘরে ‘সাসাৎ স’আ’ অনুষ্ঠান সম্পাদন করে থাকেন।

এটি হচ্ছে ওয়ানগালার আসল অনুষ্ঠান এবং এ অনুষ্ঠানেই লোকজন বেশি জমা হয়। প্রায় অন্যান্য অনুষ্ঠানের মতই এখানে পুরুষ লোকেরা পেছনের দিকে এবং মহিলারা বাড়ীর সামনের দিকে জড়ো হয়ে থাকে। এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভাত, তরি-তরকারী একত্রে মিশিয়ে এবং পঁচুই মদ পরিবেশন করা হয়। হাত দিয়েই মিশ্রিত ভাত ও তরি-তরকারী খাদ্য অতিথির মুখে জোরপূর্বক প্রবেশ করানো হয়। এতে বেশ আনন্দ পাওয়া যায়। বিশেষভাবে অতিথি যখন খাবার মুখে দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে, তখন তার মুখটাকে বাধ্য করে হা করানোটা বড় মজার ব্যাপার। এ অনুষ্ঠানে ছোট বড় সকলে তালে তালে একত্রিতভাবে বাদ্য-বাজনা বাজায়। নকমা তখন সুগন্ধযুক্ত ধুপ-ধুণা জ্বালিয়ে চতুর্দিকে ঘুরে, আর তখন সুগন্ধ ধুপের সুবাসে ঘরময় পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। আর এ সুগন্ধযুক্ত ধুপের মধ্য দিয়ে দেবতা সালজংকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়, যাতে আগামী বছরের সময়গুলোতে ফসলের ফলন আরো বৃদ্ধি পায়।

বাজনা ধীরে ধীরে থামিয়ে দেওয়া হয়। এমনি করে সালজং দেবতাকে সম্মান প্রদর্শনের পর দু’থেকে তিন-চারদিন পর্যন্ত গো ও শুকর হত্যা চু পান, খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান চলতে পারে। এ সময় গ্রামের যে কেউ যেকোন বাড়ীতে গেলে তাকে বিশেষ আতিথেয়তা প্রদর্শন করা হয়। নকমার বাড়ী থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বাড়ীতেই ভোজের অনুষ্ঠান চলতে থাকে শেষ বাড়ীটি পর্যন্ত। অতঃপর খাওয়া দাওয়ার অনুষ্ঠান শেষ হলে প্রত্যেকে যে যার কাজে আবার ফিরে যায়। গারোরা সাংসারেক হওয়ায় দেব-দেবতাকেই তাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং রক্ষাকর্তা হিসেবে মানত এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান করে তাদের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য উৎসর্গ করত। পাহাড়ের গায়ে বসবাসের কারণে তাদের মধ্যে ছিল না জ্ঞানের কোন বিকাশ।

তারা বংশ পরম্পরায় বিশ্বাস ও পালন করতো এবং এটিই ছিল তাদের পরিমন্ডল। পরবর্তীতে বিদেশী প্রচারকদের অনুপ্রেরণায় গারো সমাজে খ্রীষ্ট ধর্মের হাওয়া লেগেছিল ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দের ৮ ফেব্রæয়ারিতে। ভারতের গৌহাটির সুখেশ্বর ঘাটে আমেরিকান ব্যাপ্টিষ্ট মিশনারী দ্বারা ওমেদ মোমিনের প্রথম অবগাহনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় খ্রিস্ট বিশ্বাসের প্রথম অধ্যায়। ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দের সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্র ধরে এখন পর্যন্ত খ্রীষ্ট ধর্ম গারো জাতিতে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের মোট খ্রীষ্টান জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বেশি খ্রীষ্টবিশ্বাসী হলো গারো আদিবাসী। তারা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইতালী, আমেরিকা এবং স্থানীয় প্রচারকদের দ্বারা প্রথম খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। তারা তাদের নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে এবং মুল্যবোধে গভীরভাবে প্রোথিত ছিলেন।

তবে প্রথম দিকে তারা ব্যাপ্টিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিল। পরবর্তীতে উদ্যোগী পাচঁজন ব্যক্তি (জিরিং হাজং, থদিং হাজং, উজির রুরাম ,সিন্ধু রুগা ও থিমান দাংগ) যারা সত্য ধর্মকে জানতে চেয়ে তৎকালীন আর্চবিশপের কাছে গিয়ে ক্যাথলিক মিশনারীদের গারো অঞ্চলে প্রেরণের দাবি তোলেন করেন। এরই ফলশ্রæতিতে ময়মনসিংহে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের বিস্তার ত্বরান্বিত হয়। সংস্কৃত্যায়নের অর্থ হলো, খ্রীষ্টিয় ভাবধারার মধ্যে সত্যিকার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলোকে মিশিয়ে দিয়ে সেগুলোর মানবিক কৃষ্টিতে খ্রীষ্টিয় আদর্শকে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া।

সংস্কৃত্যায়নের ফলে খ্রীষ্টধর্মের প্রচার ও প্রসার সহজ হয় ও মানুষ তা সহজে আপন করে নেয়। সংস্কৃত্যায়নের ফলে নিজস্ব ভাষা ও কৃষ্টিতে মানুষ সহজেই খ্রীষ্টকে গ্রহণ করতে পারে, কারণ তাদের কাছে মঙ্গলসমাচার সহজেই বোধগম্য হয়। তাছাড়া উপাসনা অনুষ্ঠানে তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। ক্যাথলিক সম্প্রাদায়ের পুণ্য পিতা পোপ ত্রয়োবিংশ যোহনের আহŸানে ১৯৬৩-১৯৬৫ খ্রীষ্টাব্দে সারা বিশ্বের ক্যাথলিক বিশপদের সম্মিলনীতে এক মহাসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই মহাসভাটি হলো দ্বিতীয় ভাটিকান মহাসভা। উক্ত মহাসভাটিতেই বিজ্ঞ ধর্মপালকগণ মন্ডলীর বিষয়ে মূল্যায়ন পূর্বক এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যেখানে বলা হয়েছে  যে “বর্তমান যুগে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নতুন শিল্পরূপকে মন্ডলীর স্বীকৃতি দেয়া উচিত।

আর এগুলো যদি মন্ডলীর উপাসনা বিধির পরিপন্থী না হয় এবং ঈশ্বরের দিকে মানুষের হৃদয়-মন আকৃষ্ট করার মত প্রকাশ-ক্ষমতা যদি এদের থাকে তবে এগুলো বেদীমঞ্চে বা পুণ্যস্থানে ব্যবহার করা যেতে পারে। এভাবে মানুষ ঈশ্বরকে আরও ভাল করে বুঝতে পারবে, ঐশবাণীর প্রচার মানুষের কাছে অধিকতর বোধগম্য হবে এবং তার নিজ পরিবেশের জন্য অধিকতর উপযোগী বলেই মনে হবে”। ১৯৭৮ খ্রীষ্টাব্দে, বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপ সম্মেলনী (সিবিসিবি) এবং ঢাকার আর্চবিশপ মাইকেল রোজারিও’র অনুমোদনে ওয়ানগালা অনুষ্ঠানটি খ্রীষ্টরাজার পর্বদিনের সাথে যুক্ত করে ফসল উত্তোলনের শেষ দিন হিসেবে পালন করা শুরু হয়।

অনুষ্ঠানটি ঈশ্বরের মহিমা কীর্তনের লক্ষ্যে পালিত হয়; যা প্রত্যেক খ্রীষ্ট বিশ্বাসীর একটি নৈতিক দায়িত্ব। বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠির ঐতিহ্য, সংস্কৃতির কোন উপাদান বা উপকরণ ঈশ্বরের আরাধনায় নেওয়া যায় তা দ্বিতীয় ভাটিকানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিবিসিবি খুব বিচক্ষণ এবং সতর্কতার সাথে কার্যকর করেন। এরপর থেকে গারো (মান্দি) উপাসনা উপকমিটি তাদের আদি পুরুষদের পালিত ওয়ানগালার মূল্যবোধ ঠিক রেখে জীবন্ত ও অর্থপূর্ণভাবে উপাসনায় পালন করতে শুরু করেন। ওয়ানগালা ছিল ফসল তোলার অনুষ্ঠান যা বর্তমানে খ্রীষ্ট রাজার পর্ব এবং একই সাথে কাথলিক বর্ষের শেষ দিন হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। অতীতে ওয়ানগালায় মিসি-সালজং কে সূর্য ও শস্য দেবতা হিসেবে পূজা করা হত, কারণ সে ছিল দয়ালু ও বিশ্ব-পৃথিবীর রাজা।

অন্যদিকে, যীশু হলেন স¦র্গ ও পৃথিবীর রাজা যিনি আরাধনার পরম পূজ্য। সুতরাং, গারোদের জন্য খ্রীষ্ট রাজার পর্বটি নিজের করে পালন করা এবং এর অর্থ বুঝা সহজতর হয়েছে। গারো উপাসনা উপকমিটির উৎসাহে ওয়ানগালা অনুষ্ঠানটি  খ্রীষ্ট রাজার পর্বে রূপ লাভ করে মিসি-সালজং’র পরিবর্তে যীশুকে পূজা- আরাধনা করা হয়ে থাকে। রেভা: বিশপ ফ্রান্সিস এ গমেজের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং রেভা: ফাদার পিটার রেমা ও সিস্টার মেরিয়াম রুরামের উদ্যোগে খ্রীষ্ট রাজার পর্বদিনে খ্রীষ্টিয় ভাবধারায় প্রথম ওয়ানগালা উদ্যাপিত হয় বিড়ইডাকুনী মিশনে।

পরবর্তীতে এক এক করে অন্যান্য ধর্মপল্লীগুলোতে খ্রীষ্ট রাজার পর্বদিনে তা পালন করা শুরু হয়। বর্তমানে গারোদের বিস্তৃতি এবং নগর কেন্দ্রিক জীবন যাত্রার কারণে ঢাকা ও ময়মনসিংহ শহরেও তা প্রত্যেক বছর পালিত হয়ে আসছে। আর তা পালনের প্রথম উদ্যোগতাগণ ছিলেন বনানীতে অধ্যয়নরত তৎকালীন গারো সেমিনারীয়ানগণ। ওয়ানগালা উৎসব আমাদের ফেলে আসা পুরানো গারো ইতিহাসের আদিমতার পুনরাবৃত্তি নয়। ইহা ঐতিহ্যমন্ডিত সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবনদর্শন বিশ্বাসকে সৃষ্টি রহস্যের সাথে গভীরভাবে সহযোগিতা করা এবং জাতীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জীবিত হয়ে খ্রীষ্টিয় জীবনে আরো সচেতনভাবে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভ করা।

তাই ঐতিহ্যবাহী ওয়ানগালা উৎসব আমাদের সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয় সৃষ্টিকর্তার প্রতি পূর্ব-পুরুষদের বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞ অন্তর এবং সকল দানের জন্য পালনকর্তার প্রতি চির কতজ্ঞ থাকার ঐতিহ্যগত শিক্ষা। আজ সময়ের ব্যবধানে হয়তোবা সেই সব উৎসব এবং সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক তৎপরতা ক্রমান্বয়ে লোপ পেতে বসেছে সন্দেহ নেই কিন্তু যে কোন ধর্মীয় উৎসব আয়োজনে, সামাজিক প্রয়োজনে সম্মিলিত সহযোগিতা, সম্মিলিত অংশগ্রহণ আজোও গারোদের মাঝে সুলভ। এক্ষেত্রে গারোরা এখন পর্যন্তও সর্বপ্রকার ধর্মীয় সাম্প্রাদায়িকতার উর্ধ্বে এবং ইহাই হচ্ছে গারোদের সামাজিক লোকাচারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

তারা খ্রীষ্টকে গ্রহণ করে নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে যোগ করেছেন এক নতুন মাত্রা; যারা নিজ নিজ সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে লালন করে এবং সেগুলোকে বুনিয়াদ করে খ্রীষ্টকে রাজাধিরাজ, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা রূপে স্বীকার করে তারই চরণে নিজেদের সকল নৈবেদ্য উৎসর্গ করছে। কাথলিক খ্রীষ্টান গারোরা এখন আর মিসি সালজং, সুসুমে, তাতারা-রাবুগা দেবতাদের নয় বরং একমাত্র খ্রীষ্টকেই তাদের জীবনের গতি, স্থিতি, জীবন, মরণ বলে নত মস্তকে প্রণিপ্রাত করে। তাদের এ বিশ্বাস যেন যুগ যুগ ধরে অবিচল থাকে, থাকে অমলিন।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

সাপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমার দিন
তাকমিল পরীক্ষা প্রস্তুতি: বুখারিতে ভালো ফলাফল পেতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
যে দোয়া পড়লে বালা মুসিবত দূর হয়
এবার ওমরা চালুর কথা ভাবছে সৌদি
বায়তুল মোকাররমে ঈদুল আজহার ছয়টি জামাত
৯ বছরে নবীজির জীবনীগ্রন্থ লিখলেন আল্লামা মাসঊদ

আরও খবর